বহু প্রাচীনকালে চিনের দার্শনিক মেনসিয়াস, ভারতের কৌটিল্য ও ইতালির দার্শনিক মেকিয়াভেলির রচনায় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পর্যালোচনা গুরুত্ব লাভ করে। বস্তুত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক একটি স্বতন্ত্র পাঠ্যবিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্বগত আলোচনার সূত্রপাত ঘটে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল বিষয়। ঠাণ্ডা লড়াইয়ের পরবর্তী যুগে একক মহাশক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে মার্কিনি আধিপত্য, সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের নিষ্ক্রিয়তা, নয়া-বিশ্বব্যবস্থায় বিশ্বায়নের প্রভাব, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার প্রতিপত্তি, জাতীয় রাষ্ট্রের সার্বভৌমিকতার সাবেকি সংজ্ঞার আমূল পরিবর্তন ইত্যাদির ফলে বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রকৃতি এক নতুন যুগসন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মুখ্য ধারণাগুলির মধ্যে রয়েছে জাতীয় শক্তি বা ক্ষমতা, জাতীয় স্বার্থ, জোটনিরপেক্ষতা ও বিশ্বায়ন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শক্তি বা ক্ষমতার ভূমিকা প্রধান। বর্তমানে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তি বা ক্ষমতা একটি কেন্দ্রীয় ধারণারূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রকে অতিবৃহৎ শক্তি, বৃহৎ শক্তি, মাঝারি শক্তি, ক্ষুদ্র শক্তি ইত্যাদি রূপে বিভক্ত করা হয়। অবশ্য আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা শক্তি বা ক্ষমতা বলতে শুধুমাত্র সামরিক ক্ষমতাকে বোঝাতে চাননি। জাতীয় শক্তি বা ক্ষমতার মতো জাতীয় স্বার্থের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি জাতীয় স্বার্থকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে যুদ্ধোত্তর বিশ্বে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিকে নিয়ে যে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন গড়ে ওঠে তা বর্তমান একমেরু বিশ্বে অনেকটাই তাৎপর্যহীন। পরিবর্তিত দুনিয়ায় জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন নতুন ভূমিকায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। আজকের যুগকে অনেকে বিশ্বায়নের যুগ বলে চিহ্নিত করার পক্ষপাতী। বিশ্বায়ন কোনো নতুন ধারণা না হলেও ১৯৯১ সালের পরে ঠান্ডা লড়াইমুখ দুনিয়ায় তার নতুন প্রয়োগ শুরু হয়েছে।
Trygve Mathiesen [Methodology in the study of International Relations]
International Relations embraces all kinds of relations traversing state boundaries; no matter whether they are of an economic, legal, political or any other character, whether they be private or official.
গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টট্ল সরকারের কাজকর্মকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছিলেন-১) সিদ্ধান্ত- মূলক, ২) শাসনসংক্রান্ত এবং ৩) বিচারসম্পর্কিত। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থাতেও মূলত শাসনবিভাগ, আইনবিভাগ এবং বিচারবিভাগের মাধ্যমে সরকারের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। রাষ্ট্র আজও এক বিমূর্ত ধারণা, সরকার তার বাস্তব প্রতিনিধি। শাসনবিভাগ, আইনবিভাগ ও বিচারবিভাগের কাজকর্মের মাধ্যমে রাষ্ট্রের চরিত্র অনুধাবন করা যায়। এই তিনটি বিভাগের কার্যাবলি এদিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শাসনবিভাগের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাপক অর্থে শাসনবিভাগ বলতে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে প্রশাসনের একজন সর্বনিম্ন সাধারণ কর্মী পর্যন্ত সকল পদাধিকারীকেই বোঝায়। শাসনবিভাগ তার দুটি অংশ, যথাক্রমে রাজনৈতিক অংশ (মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়ক প্রমুখ) এবং অরাজনৈতিক অংশের (উচ্চপদস্থ আমলা, সরকারি স্থায়ী কর্মচারী প্রমুখ) মাধ্যমে যাবতীয় কাজকর্ম সম্পাদন করে থাকে। আধুনিক রাষ্ট্রে আইনবিভাগেরও একটি স্বতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। সংসদীয় ব্যবস্থায় আইনবিভাগের গুরুত্ব সর্বাধিক। রাষ্ট্রপতি-শাসিত ব্যবস্থায় (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে) এর ব্যতিক্রম লক্ষ করা যায়। অন্যদিকে রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী কাঠামো হল বিচারবিভাগ। বিচারবিভাগ ব্যতীত রাষ্ট্র একটি কষ্টকল্পনামাত্র। অধ্যাপক গার্নারের মতে, “...a civilized state without judicial organs and machinery is hardly conceivable”। ল্যাঙ্কির মতে বিচারকার্য পরিচালনার মধ্য দিয়ে একটি রাষ্ট্রের নৈতিক চরিত্র অনুধাবন করা যায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আধুনিক লেখকদের বক্তব্য হল বিচার-বিভাগের ভূমিকা ও কার্যাবলি প্রধানত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। এই কারণে যেসব দেশের সংবিধানে বিচারবিভাগের প্রাধান্যকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে সেখানে বিচারবিভাগ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সাম্প্রতিককালে রাষ্ট্রের বিচারবিভাগীয় সক্রিয়তা (Judicial Activism)বিচারব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে।
This is to say, there are seven main centres of political activity, the cooperation of which is necessary to produce a complete act of government. The seven are, in practice, inter-locking and essential to each other, though there may be jealousy and distrust among their actual personnel.
- Herman Finer [The Theory and Practice of Modern Government, p. 169]
রাষ্ট্রের একটি অপরিহার্য মৌলিক উপাদান হল ‘সরকার’। বস্তুত State বা রাষ্ট্রকে আমরা চোখে দেখতে পাই না; এটি নিতান্তই একটি তত্ত্বগত বা বিমূর্ত ধারণা। 'সরকার'-ই হল রাষ্ট্রের বাস্তব রূপ। অধ্যাপক গেটেলের মতে, সরকার হল রাষ্ট্রের একটি যন্ত্র বা সংগঠন।
গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টট্ল তাঁর The Politics গ্রন্থে সরকারের শ্রেণিবিভাজনের বিষয়টিকে তুলে ধরেন। অ্যারিস্টট্ল শাসনব্যবস্থাকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন- ১)রাজতন্ত্র (বিকৃত রূপ-স্বৈরতন্ত্র), ২)অভিজাততন্ত্র (বিকৃত রূপ-ধনতন্ত্র) এবং ৩)নিয়মতন্ত্র (বিকৃত রূপ-গণতন্ত্র)।
প্রাচীন গ্রিসের প্রেক্ষিতে করা অ্যারিস্টটলের এই শ্রেণিবিভাগ আধুনিক যুগে প্রযোজ্য নয়। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যে লীকক ও ম্যারিয়ট প্রমুখ সরকারের এক ভিন্নতর রূপ উপস্থাপিত করতে চেয়েছেন। পরবর্তীকালে আচরণবাদী রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যে অ্যালমন্ড ও পাওয়েল সরকারের বদলে রাজনৈতিক ব্যবস্থার শ্রেণিবিভাজন উপস্থাপিত করেছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যারিয়ট বর্তমান যুগে সরকারের শ্রেণিবিভাজনকে তিনটি দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করেছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যারিয়ট মতে সরকারের শ্রেণিবিভাজন এইরকম:- ১) এককেন্দ্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় (ক্ষমতা বণ্টনের ভিত্তিতে), ২) সুপরিবর্তনীয় ও দুষ্পরিবর্তনীয় (সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতির দিক থেকে) এবং ৩) মন্ত্রীপরিষদ শাসিত ও রাষ্ট্রপতি শাসিত (আইনবিভাগের সঙ্গে শাসনবিভাগের সম্পর্কের ভিত্তিতে)। আচরণবাদী রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করেন, রাষ্ট্রচরিত্রের আভাস সরকারের শ্রেণিবিভাজনের মধ্যে পাওয়া যায় না। এই কারণে তাঁরা সরকারের বদলে রাজনৈতিক ব্যবস্থার শ্রেণিবিভাজন করেছেন এইভাবে—১) উদারনৈতিক গণতন্ত্র, ২) সর্বাত্মকতন্ত্র এবং ৩) স্বৈরতন্ত্র।
The truth is, there seems to be no single principle or criterion, juridical or otherwise. upon which a satisfactory classification of states can be made...It is believed that by reason of the peculiar nature of states any attempt to differentiate between them and to classify them is scientifically as largely futile and leads to results which have little or no practical or scientific value.
-J. W. Garner [Political Science and Government, p. 255-56]
ডেভিড ইস্টন তাঁর The Political System গ্রন্থে সাধারণভাবে রাজনৈতিক দর্শনের আলোচনাকে রাজনৈতিক তত্ত্ব বলে অভিহিত করেছেন। ইস্টন রাজনৈতিক তত্ত্বকে মূল্যবোধযুক্ত তত্ত্ব (Value Theory) এবং সাময়িক তত্ত্ব (Casual Theory) এই দুভাগে বিভক্ত করেছেন। সনাতন রাজনৈতিক তত্ত্বগুলি তাদের রাজনৈতিক আলোচনাকে মূল্যবোধযুক্ত করে উপস্থাপিত করে। অন্যদিকে, যেসব রাজনৈতিক তত্ত্ব শুধুমাত্র বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যেকার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে, সেখানে সাময়িক তত্ত্ব গড়ে ওঠে।
প্রধান রাজনৈতিক মতাদর্শরূপে যেগুলি তুলে ধরা হয়েছে সেগুলি হল উদারনীতিবাদ, মার্কসীয় মতবাদ, গান্ধিজির মতাদর্শ এবং ফ্যাসিবাদ। ইংল্যান্ডে সপ্তদশ শতাব্দীতে উদারনীতিবাদের উদ্ভব ঘটে। রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিস্বাধীনতার নীতি প্রতিষ্ঠা হল উদারনৈতিক মতাদর্শের মূল বক্তব্য। অন্যদিকে মার্কসীয় মতবাদ হল চিরাচরিত রাজনৈতিক মতাদর্শের জগতে সর্বাধুনিক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। জার্মান দর্শন, ব্রিটিশ অর্থশাস্ত্র ও ফরাসি সমাজতন্ত্র—এই তিনটি প্রধান উৎসের ওপর ভিত্তি করে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে গড়ে ওঠে মার্কসীয় মতবাদ। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে অহিংসা, সত্যাগ্রহ, সর্বোদয় প্রভৃতিকে নিয়ে গান্ধিজির চিন্তাধারা এক মানবতাবাদী নৈতিক মতাদর্শের জন্ম দেয়। অন্যদিকে রাষ্ট্রসর্বস্ব ফ্যাসিবাদের উৎপত্তি ঘটে ইতালির বেনিতো মুসোলিনির হাত ধরে ১৯১৯ সালে। আগ্রাসী জাতিবিদ্বেষ, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ফ্যাসিবাদ এক সর্বনিয়ন্ত্রণবাদী রাজনৈতিক মতাদর্শরূপে পরিচিত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় মিত্রশক্তির নেতারা নতুন একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। প্রকৃতপক্ষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার প্রয়াস শুরু হয়ে যায়। ১৯৪১ সালের জানুয়ারি মাসে মার্কিন রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট মার্কিন কংগ্রেসে যেসব নীতি ঘোষণা করেন তার মাধ্যমে জাতিপুঞ্জ গঠনের প্রচেষ্টার সূত্রপাত ঘটে। ১৯৪২ সালে বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন শিক্ষাবিদদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটি যুদ্ধের সর্বনাশা অবস্থা থেকে পরিত্রাণের চিন্তা শুরু করে। ১৯৪৩ সালে তেহেরান সম্মেলন, ১৯৪৪ সালে ব্রেটন উডস সম্মেলন ও ডাম্বারটন ওকস্ সম্মেলন, ১৯৪৫ সালে ইয়াল্টা ও সানফ্রান্সিসকো সম্মেলনের মাধ্যমে বিভিন্ন রাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দ ও শান্তিকামী মানুষের শুভেচ্ছায় জাতিপুঞ্জ গঠনের পথ প্রশস্ত হয়। এইভাবে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা ও পরিকল্পনার পরে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৪৫ সালের ২৪শে অক্টোবর সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের উদ্ভব ঘটে। বিশ্বের ৫১টি দেশের প্রতিনিধিরা সর্বসম্মতভাবে গৃহীত জাতিপুঞ্জের সনদে স্বাক্ষর করেন।
বিভিন্ন রাষ্ট্র ও জাতি নিয়ে গঠিত এই আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রস্তাবনায় বিশ্বশান্তির প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার ঘোষিত হয়েছে। জাতিপুঞ্জের সনদের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, যে-যুদ্ধের করাল গ্রাস দু-দুবার মানবজাতির জীবনে দুর্বিষহ সংকট সৃষ্টি করেছে তা থেকে আগামী প্রজন্মকে মুক্ত রাখাই জাতিপুঞ্জের মুখ্য উদ্দেশ্য। সনদে উল্লিখিত প্রস্তাবনায় এই অঙ্গীকার দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, "WE THE PEOPLE OF THE UNITED NATIONS determined to save succeeding generations from the scourge of war, which twice in our lifetime has brought untold sorrow to mankind and to reaffirm faith in fundamental human rights, in the dignity and worth of the human person in the equal rights of men and women and of nations large and small."
The failure of the United Nations is the failure of the human community. The explanation is as simple as that. The United Nations will be as strong or as weak as its members wish it to be.
-Introduction to the Report of the Secretary-General 1975-76
প্রাচীন গ্রিস ও রোমের নগররাষ্ট্রগুলিতে যাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনার কাজকর্মে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন, তাঁদেরই একসময় নাগরিক আখ্যা দেওয়া হত। সে-যুগে শুধুমাত্র অভিজাত পুরুষরা নাগরিক অভিধায় ভূষিত হতেন। ক্রীতদাস, মহিলা ও শ্রমিকরা রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে অংশ নিতে না পারায় নাগরিক হতে পারতেন না। যুগের পরিবর্তনের ফলে নাগরিকত্ব সম্পর্কিত আধুনিক ধারণার বিকাশ ঘটেছে। বর্তমানে কোনো রাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী ও রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে আনুগত্য প্রদর্শনকারী সমস্ত ব্যাক্তিকে নাগরিকরূপে অভিহিত করা হয়।
নাগরিকরা রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করার বিনিময়ে রাষ্ট্রপ্রদত্ত কিছু সুযোগসুবিধা বা অধিকার ভোগ করে থাকে। সাধারণভাবে অধিকারকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়-নৈতিক অধিকার এবং আইনগত অধিকার। নৈতিক অধিকার সামাজিক ন্যায়নীতিবোধকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। নৈতিক অধিকার ভঙ্গ করলে রাষ্ট্র কোনো শাস্তি দিতে পারে না। অন্যদিকে আইনগত অধিকার আইনের মাধ্যমে স্বীকৃত ও সংরক্ষিত হয়। আইনগত অধিকার লঙ্ঘিত হলে রাষ্ট্রের শাস্তি দেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে। আইনগত অধিকার প্রধানত চার ভাগে বিভক্ত-পৌর বা ব্যক্তিগত অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার এবং সামাজিক ও কৃষ্টিগত অধিকার।
১৯৪৫ সালে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সনদে মানবাধিকার-সংক্রান্ত ধারণার উদ্ভব ঘটে। পরে জাতিপুঞ্জের উদ্যোগে ১৯৪৮ সালে গৃহীত হয় ‘মানবাধিকার সংক্রান্ত বিশ্বজনীন ঘোষণা’। অবশ্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, মানবাধিকারের ধারণা বহু পূর্বে 'প্রাকৃতিক অধিকার তত্ত্বের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। মানবাধিকার হল এমন এক অধিকার যা জন্মসূত্রে সব মানুষের সমানাধিকার ও সমমর্যাদার নীতিকে ঘোষণা করে। প্রতিটি মানুষের আত্মমর্যাদা নিয়ে জীবনধারণের অধিকার, স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার এবং সমতা ও সমমর্যাদার অধিকার হল মানবাধিকার।
Rights and duties are correlative conceptions: that is to say every right comes w a corresponding obligation. They are like the two sides of a coin. Rights depend upon duties. It is only in a world of duties that rights have significance.
১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারী ভারতীয় সংবিধানে নাগরিকত্ব কার্যকরী করা হয়। এই সংবিধান অনুযায়ী ভারতে যাদের স্থায়ী বাসভূমি আছে একরকম প্রতিটি ব্যক্তিই ভারতের নাগরিক হবার যোগ্য।
এছাড়া নীচে বর্ণিত ব্যক্তিগণও ভারতের নাগরিক হবার যোগ্য। যেমন-
১) যে ব্যক্তি ভারতে জন্মগ্রহণ করেছেন।
২) যাদের পিতা বা মাতা ভারতে জন্মগ্রহণ করেছেন।
৩) ভারতীয় সংবিধান চালু হবার পাঁচ বছর আগে থেকে যারা স্থায়ীভাবে ভারতে বসবাস করে আসছেন। (Indian Act 5 & 6)
●বর্তমান পাকিস্তান বা বাংলাদেশের কোন স্থান থেকে যদি কোন ব্যক্তি মাইগ্রেশন করে ভারতের কোন অংশে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন, ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী তাকে ভারতের নাগরিক বলে গণ্য করা হবে।
●যদি কোন ব্যক্তি নিজে অথবা তার পিতা, মাতা, পিতামহ বা মাতামহ ভারতে জন্মে থাকেন, তাহলে তাকেও ভারতের নাগরিক বলা হবে।
● Govt. of India Act. এ বলা হয়েছে ১৯৪৮ সালের ১৯শে জুলাইয়ের আগে যদি কোন ব্যক্তি বাইরে থেকে ভারতে এসে বসবাস করতে থাকেন তাহলে তিনি ভারতের নাগরিকত্ব পাবার অধিকারী।
●১৯৪৮ সালের ১৯শে জুলাইয়ের আগে বা পরেও যদি কোন ব্যক্তি মাইগ্রেশন করে ভারতে এসে নাগরিকরূপে নিজের নাম রেজিষ্ট্রি করে থাকেন, তবে তিনিও ভারতের নাগরিকরূপে গণ্য হবেন।
আবার যারা নিজের নাম রেজিষ্ট্রি করেন-নি বা করতে পারেন-নি তাদের নাগরিকত্বের জন্য আবেদনের তারিখের ৬ মাস আগে থেকে ভারতে বসবাস করার সার্টিফিকেটদিতেহবে।
উ:- না, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনা মূল্যমান-নিরপেক্ষ নয়।
৬) রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে একটি 'প্রগতিশীল বিজ্ঞান' কে বলেছেন?
উ:- লর্ড ব্রাইস
৭) Politics গ্রন্থটির লেখক কে?
উ:-গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টট্ল
৮) The Republic গ্রন্থটি কার লেখা?
উ:- প্লেটো
৯) বহুত্ববাদী তত্ত্বের একজন প্রবক্তার নাম লেখো।
উ:- ল্যাস্কি
১০) কত সালে প্যারিসে 'আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান সম্মেলন' অনুষ্ঠিত হয়েছিল?
উ:- ১৯৪৮ সালে
১১) কে রাজনীতিকে 'অর্থনীতির ঘনীভূত প্রকাশ' বলেছেন?
উ:- লেনিন
১২) Modern Politics and Government গ্রন্থটি কার লেখা?
উ:- অ্যালান বল
১৩) রাজনীতি হল 'মূল্যের কর্তৃত্বমূলক বন্টন'-কে বলেছেন?
উ:- ডেভিড ইস্টন
১৪) The Political Man কার লেখা?
উ:- লিপসেট
১৫) 'রাষ্ট্রবিজ্ঞান সূচনা ও সমাপ্তি রাষ্ট্রকে নিয়েই'-কার উক্তি?
উ:- গার্নার
১৬) রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান বলতে নারাজ এমন একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর নাম লেখো।
উ:- রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কোঁৎ
১৭) কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে 'শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান' বলেছেন?
উ:- গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টট্ল
১৮) 'পলিটিক্স' (Politics) শব্দটি কোন্ শব্দ থেকে এসেছে?
উ:- গ্রিক শব্দ 'পোলিস' (Polis) থেকে এসেছে।
১৯) কোথায় রাষ্ট্রবিজ্ঞান শব্দটি সর্বপ্রথম আধুনিক অর্থে ব্যবহৃত হয়?
উ:- ১৮৯০ সালে 'আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থতালিকা'তে
২০) Politics: Who Gets What, When, Howগ্রন্থের লেখক কে?
উ:- হ্যারল্ড ল্যাসওয়েল
২১) ডেভিড ট্রুম্যানের লেখা গ্রন্থের নাম কি?
উ:- The Governmental Process
২২) কে প্রথম রাষ্ট্রবিজ্ঞান শব্দটি প্রয়োগ করেন?
উ:- ১৭০১ সালে বিশপকে লেখা এক চিঠিতে লিবনিজ প্রয়োগ করেন।
২৩) একজন ঐতিহ্যবাহী উদারনীতিবাদী চিন্তাবিদের নাম লেখো।
উ:- জন স্টুয়ার্ট মিল
২৪) রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাঠের দুটি পরস্পরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি কি কি?
উ:- উদারনীতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি
২৫) রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত যে-কোনো দুটি সমাজবিজ্ঞানের নাম লেখো।
উ:- ইতিহাস ও সমাজতত্ত্ব
২৬) 'রাষ্ট্রবিজ্ঞান হল সমাজবিজ্ঞানের সেই অংশ, যা রাষ্ট্রের ভিত্তি ও সরকারের নীতিসমূহ নিয়ে আলোচনা করে'-কার উক্তি?
উ:- পল জেনেট
২৭) শ্রেণিহীন ও রাষ্ট্রহীন সমাজব্যবস্থাকে মার্কস কী নামে অভিহিত করেন?
উ:- সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা
২৮) মিলার রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে কি বলে অভিহিত করেছেন?
উ:- মূলত 'বিরোধজনিত পরিস্থিতির মীমাংসা' বলে অভিহিত করেছেন।
২৯) 'যাঁরা রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান বলতে চান না, তাঁরা বিজ্ঞান কাকে বলে, তা জানেন না'।-উক্তিটি কার?
উ:- ফ্রেডারিক পোলক-এর
৩০) 'মানুষের রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করাই হল রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়'-কে বলেছেন?
উ:- ল্যাস্কি
৩১) 'যখন আমি কোনো পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের শিরোনামে রাষ্ট্রবিজ্ঞান কথাটি লেখা থাকতে দেখি, তখন আমি ওইরূপ শিরোনামের জন্য বিশেষ দুঃখবোধ করি, প্রশ্নগুলির জন্য নয়'।-কার উক্তি?
উ:- মেটল্যান্ড-এর
৩২) 'বর্তমান অবস্থায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান বলে অভিহিত করা তো যায়ই না, এমনকি কলা বিষয়ের মধ্যেও অত্যন্ত অনুন্নত'-বক্তব্যটি কার?
উ:- রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বাক্ল-এর
৩৩) 'যে মানুষ সমাজে বাস করে না, সে হয় দেবতা, না হয় পশু'-কে বলেছেন?
উ:- গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টট্ল
৩৪) 'সৌন্দর্যতত্ত্বের বিজ্ঞান বলে যেমন কোনো বিজ্ঞান নেই, তেমনই রাষ্ট্রতত্ত্বের বিজ্ঞান বলেও কিছু নেই'।-কার উক্তি?
উ:- রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বার্ক-এর
৩৫) Marxism and Politics গ্রন্থের প্রণেতা কে?
উ: রালফ মিলিব্যান্ড (Ralph Miliband)
৩৬) The Idea of Politics গ্রন্থের প্রণেতা কে?
উ:- মরিস দ্যুভারজার
৩৭) 'মূল্যবোধ ছাড়া সামাজিক ঘটনার আলোচনা অসম্ভব'-কার উক্তি?