বুধ গ্রহ আসলে কি? কেমন তার আবহাওয়া?

বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

কলকাতায় প্রথম ধর্মঘট কবে এবং কেন হয়েছিল?

বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

বিভিন্ন প্রাণীর রেচন অঙ্গের নাম ও তার ছবি

বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

ভারতের ক্ষমতা হস্তান্তর আইন

বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

সালোকসংশ্লেষ সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য

বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

হিন্দু তথা সনাতন ধর্মের সমস্ত ধর্ম গ্রন্থসমূহ

বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন

দর্শনশাস্ত্র লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
দর্শনশাস্ত্র লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৩

ভারতীয় দর্শন কি প্রকৃতির?

 ভারতীয় দর্শন কি প্রকারের?

দার্শনিক আলোচনা প্রধানত বিমূর্ত আলোচনা। যে সকল অতীন্দ্রিয় বিষয় নিয়ে দর্শন আলোচনা করে তাদের তত্ত্বজ্ঞান আমরা কখনই ইন্দ্রিয়-প্রত্যক্ষের দ্বারা লাভ করতে পারি না। এই কারণে দর্শনে বিচারবুদ্ধি ও যুক্তি-তর্কের স্থান সবার উপরে। আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনে অবশ্য সাধারণ মানুষের লৌকিক প্রত্যক্ষ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির উপর দর্শনকে প্রতিষ্ঠা করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।কিন্তু ভারতীয় দর্শন মনে করে যে দর্শনের বিষয়বস্তু যেহেতু বিমূর্ত ও অতীন্দ্রিয় সেহেতু অলৌকিক ও অতীন্দ্রিয় অনুভূতি ছাড়া দর্শনের বিষয়বস্তুর উপলব্ধি সম্ভব নয়। ভারতীয় দর্শনের ক্ষেত্রে এই উপলব্ধি আবার প্রধানত মুনি-ঋষিদের উপলব্ধি বলে ধার হয়। তবে শুধুমাত্র এই উপলব্ধির মধ্যেই দার্শনিক আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। দর্শন শুরুর উপদেশ মাত্র নয়। তাই দর্শনের ক্ষেত্রে এই উপলব্ধি যুক্তি, বিচার ও মননের অপেক্ষা রাখে। ভারতীয় দর্শন একদিকে যেমন প্রতিটি সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতার উপলব্ধিনির্ভর তেমনি অপরদিকে যুক্তি, বিচার ও মনননির্ভর। প্রতিটি সম্প্রদায় তাঁদের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তি, বিচার ও মননের সাহায্য নিয়েছেন। এ কথা যেমন আস্তিক সম্প্রদায়গুলির ক্ষেত্রে সত্য তেমনি নাস্তিক সম্প্রদায়গুলির ক্ষেত্রেও সত্য। কোন কোন পাশ্চাত্য চিন্তাবিদ্‌ ভারতীয় দর্শনের এই স্বরূপকে উপলব্ধি করতে পারেননি। তাঁরা ভারতীয় দর্শনকে গুরুর উপদেশ বা আপ্তোপদেশ মাত্র বলে বর্ণনা করেছেন। শুধু তাই নয়, তাঁরা ভারতীয় দর্শনের বিরুদ্ধে বিচারহীনতার অভিযোগ তুলেছেন। কিন্তু এই অভিযোগ সম্পূর্ণরূপে ভ্রান্ত ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। ভারতীয় দর্শনের প্রতিটি সম্প্রদায়ের ক্রমপরিণতির সুদীর্ঘ ইতিহাস এ কথাই প্রমাণ করে যেদর্শন নিছক ব্যক্তিগত উপলব্ধ সত্যের বাণীমাত্র নয়। দর্শন বিভিন্ন যুগের বিভিন্ন মনীষীর মনন ও যুক্তিনির্ভর।

বিশ্বের দার্শনিকগণ জগৎ ও জীবনকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দুটি বিপরীতমুখী মৌলিক তত্ত্বে পৌঁছেছেন। এই দুটি মৌলিক তত্ত্বের একটি হ'ল জড়তত্ত্ব এবং অপরটি হ'ল চেতনতত্ত্ব। যে মতবাদ জড়তত্ত্বকে একমাত্র সত্য বলে মনে করে সে মতবাদকে বলা হয় জড়বাদ। অপরদিকে যে তত্ত্ব স্থূলজড়ের অতিরিক্ত চেতনসত্তাকে স্বীকার করে তাকে বলে অধ্যাত্মবাদ। দেহের অতিরিক্ত চেতনসত্তাই নানা দর্শনে 'আত্মা' নামে অভিহিত হয়। অধ্যাত্মবাদীদের ভিত্তি হ'ল দেহের অতিরিক্ত আত্মায় বিশ্বাস। জৈন, বৌদ্ধ,ন্যায়-বৈশেষিক, সাংখ্য, যোগ, মীমাংসা ও বেদান্ত সকলেই আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাসী। আত্মা অতীন্দ্রিয় কি না সে বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও আত্মা যে জড়ের অতিরিক্ত তাতে এ সম্প্রদায়গুলির মধ্যে কোন মতপার্থক্য নেই। বৌদ্ধ সম্প্রদায় নিত্য আত্মায় বিশ্বাসী না হলেও চেতনা-প্রবাহ বা বিজ্ঞান-সন্তানে বিশ্বাসী। তাই দেখা যায় যে, চার্বাক ব্যতীত সকল ভারতীয় দর্শন সম্প্রদায়ের মধ্যে অধ্যাত্মবাদে বিশ্বাস অতি গভীর। এই কারণে ভারতীয় দর্শনকে অধ্যাত্মবাদী দর্শন বলা হয়।

বৃহস্পতিবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২২

নীতিমূলক উপাখ্যানের নিদর্শন: নকুল-ব্যাঘ্র-জম্বুক-বৃক-মূষিক-কথা

 

নকুল-ব্যাঘ্র-
জম্বুক-বৃক-মুষিককথা
 বর্ণনা



পুরাকালে
কোন বনে একটি জম্বুক অর্থাৎ শৃগাল
, একটি
ব্যাঘ্র
, একটি
মূষিক অর্থাৎ ইন্দুর
, একটি
বৃক অর্থাৎ নেকড়ে বাঘ এবং একটি নকুল অর্থাৎ নেউল বা বেজি পরস্পর বন্ধুভাবে বাস
করত। শৃগাল অতি ধূর্ত
, বুদ্ধিমান
ও স্বার্থপর ছিল। তারা একদা বনের মধ্যে একটি হৃষ্টপুষ্ট হরিণকে (কাশীরামে গর্ভিণী
হরিণীকে) আক্রমণ করার চেষ্টা করে বিফল হয়। শৃগালের ! বুদ্ধিতে ইন্দুর মাটিতে গর্ত
খনন করে বিশ্রামরত হরিণের কাছে পৌঁছে তার পায়ের শিরা ! কেটে দিল। ব্যাঘ্র
অনায়াসে হরিণকে বধ করল। ধূর্ত শৃগাল মৃত হরিণটিকে আগলে রেখে সকলকে স্নান করে এসে
মাংস ভক্ষণ করতে বলল। চারজনই স্নানের জন্য
 নদীতীরে গমন করল।
প্রথমে ব্যাঘ্র ফিরে এসে শৃগালকে কপটভাবে চিন্তান্বিত দেখে তার কারণ জিজ্ঞাসা করল।
শৃগাল বলল
, 'হে
মহাবীর। তোমার আগেই ইন্দুর এসে বলে গেছে যে
, তুমি
নাকি তারই সহায়তায় হরিণকে বধ করে বৃথাই আত্মগর্ব করছ। এরই প্রতিবাদস্বরূপ সে
হরিণ মাংস বর্জন করে অন্যত্র চলে গেল।
' তখন
ব্যাঘ্র ক্রুদ্ধ হয়ে বলল
, 'হে
শৃগাল! তুমি ঠিক সময়েই আমাকে কথাটা জানালে। আমি তবে নিজের শক্তিতেই শিকার ধরে
ভক্ষণ করব। আমি বনান্তরে চলে যাচ্ছি।
'



এরপরই
ইন্দুর এলে শৃগাল তাকে বলল
, 'হে
ইন্দুর
, পলায়ন
কর। নেকড়ে বলেছে যে
, এই
হরিণের মাংসে তার নাকি অভিরুচি নেই। সে তোমাকে বধ করে খেতে চায়।
' ভীত ইন্দুর সঙ্গে সঙ্গে
গর্তের মধ্যে প্রবেশ করল। কিছুকাল পরে নেকড়ে বাঘ ফিরে এলে শৃগাল বলল
, ভাই
! না জানি ব্যাঘ্র তোমার ওপর কি কারণে ক্রুদ্ধ হয়ে তোমাকে হত্যার জন্য খুঁজছে।
' মাংসাশী নেকড়ে বাঘ ভীত ও
সঙ্কুচিত হয়ে সঙ্গে সঙ্গে সেইস্থান থেকে পলায়ন করল। এই অবসরে নেউল বা বেজি স্নান
করে এলে শৃগাল রুদ্রমূর্তি ধারণ করে বলতে লাগল
, ওহে বেজি। আমি নিজের শক্তিতে ব্যাঘ্র, ইন্দুর ও নেকড়ে বাঘকে পরাস্ত
করেছি। তারা আমার ভয়ে এই বন পরিত্যাগ করে পলায়ন করেছে। তুমি আমার সাথে যদি
যুদ্ধে জয়লাভ করতে পার তবেই এই হরিণের মাংস ভক্ষণ করতে পাবে।
' নেউল বা বেজি প্রাণভয়ে
পলায়ন করবার আগে বলে গেল
, হে শৃগাল। শক্তিশালী ব্যাঘ্র ও নেকড়ে বাঘ
এবং বুদ্ধিমান্ ইন্দুর যেখানে পরাজিত হয়েছে
, সেখানে
আমি তো তুচ্ছ। আমার হরিণ মাংসে দরকার নেই।
'



এইভাবে
শৃগাল অসাধারণ বুদ্ধিবলে সকলকে বিদায় করে পরমসুখে একাকী হরিণমাংস ভক্ষণ করেছিল।



এই
কাহিনী থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি
, যে
ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ শৃগালের মতো আচরণ করেন তিনি চিরকাল সুখভোগ করে থাকেন। ভীত
ব্যক্তিকে ভয় প্রদর্শন
, বীরের
নিকট বিনয়ভাব
, লুব্ধকে
অর্থদান
, সম
বা ন্যূন ব্যক্তিকে বল প্রকাশ করে বশীভূত করা উচিত। পুত্র
, সখা, ভ্রাতা, পিতা এবং গুরুও যদি শত্রুর
মতো বিদ্রোহাচরণ করেন
, তাহলে
তৎক্ষণাৎ তাঁদের বিনষ্ট করা প্রয়োজন। ব্যাধি
, অগ্নি
ও ঋণ কখনও পোষণ করে রাখা উচিত নয়
, কারণ
দিনে দিনে সেগুলি বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে সম্পূর্ণ বিনাশের কারণ হয়ে ওঠে। সেইরকম
শত্রুকেও শপথ
, অর্থদান, বিষপ্রয়োগ বা মায়া প্রকাশ
করে বিনাশ করা বিধেয়
, কখনও
উপেক্ষা করা সঙ্গত নয়। কোন শত্রুকে একবারও দণ্ড দান করে যে রাজা ধন-মান ইত্যাদি
প্রদানপূর্বক অনুগ্রহ করেন তিনি নিজের মৃত্যু সংগ্রহ
 করে রাখেন।

শনিবার, ১৪ মে, ২০২২

পৃথিবীতে নারী ও তার সৌন্দর্য্যের কারণ

 নারী
ও তার সৌন্দর্য্য



নারীর
সৌন্দর্য্য জগতের এক অপরূপ বস্তু
; বিধাতার
দান। কিন্তু সে-সৌন্দর্য্য পুরুষকে মোহিত করবার জন্যে নয়
, সে-সৌন্দর্য্য, শক্তির মত, স্বাস্থ্যের মত, নারীরই পরম প্রয়োজনীয়
জিনিস। প্রত্যেক নারীই দেহগত সৌন্দর্য্যের অধিকারী নন
, কিন্তু প্রত্যেক নারীই নিজেকে
সুন্দর করে রাখতে পারেন এবং নিজেকে সুন্দর করে রাখা প্রত্যেক বিবাহিতা নারীর অবশ্য
কর্তব্য। বিলাসিতা না করেও
, প্রত্যেক
নারী যথাসম্ভব নিজেকে সজ্জিত ও অমলিন রাখতে পারেন। বিবাহের কয়েক বৎসর পরে
, অনেক নারীই আর নিজের সজ্জা ও
সৌন্দর্য্য সম্বন্ধে অবহিত থাকা প্রয়োজনীয় মনে করেন না। সেটা মস্ত বড় ভুল।
স্বামীর মনস্তত্বে তার প্রভাব ক্ষতিকরই হয়।

This information in English

শুক্রবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২২

মহাভারতের বিভাবসু-সুপ্রতিকের উপাখ্যান

নীতিমূলক
উপাখ্যান



বিভাবসু-সুপ্রতিকের
উপাখ্যান



বিভাবসু
একজন ক্রোধপরায়ণ মুনি। শত্রুদের প্ররোচনায় তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা সুপ্রতীক পিতৃধন
বিভাগের জন্য বারংবার পীড়া-পীড়ি করতে থাকেন। বিভাবসু ভিন্ন হবার কুফল বোঝাতে বৃথাই
বহু চেষ্টা করেন এবং শেষ পর্যন্ত বিরক্ত ও ক্রুদ্ধ হয়ে ভ্রাতাকে গজমূর্খের মতো
আচরণ করায় গজ হবার অভিশাপ প্রদান করেন। গজমূর্খ বলতে এখানে পণ্ডিত হয়েও
বুদ্ধিহীনের মতো আচরণের কথা বলা হয়েছে। সুপ্রতীকও তখন জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে জল ও
স্থলের অর্থাৎ উভয় স্থানের অংশ দখলদার কচ্ছপের মতো আচরণকারী বিবেচনাপূর্বক কচ্ছপ
হবার জন্য পালটা অভিশাপ প্রদান করেন। এরই ফলস্বরূপ বিভাবসু ও সুপ্রতীক যথাক্রমে
বিশালাকায় গজ ও কচ্ছপরূপে বহুকালব্যাপী এক সরোবরের তীরে যুদ্ধরত হয়ে কালযাপন
করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত উভয়েই গরুড়ের গ্রাসে অর্থাৎ খাদ্যে পরিণত হয়ে মৃত্যুমুখে
পতিত হন।



এর
থেকে আমরা এই নীতিশিক্ষায় উপনীত হই:-



স্বার্থপর
মূঢ় ব্যাক্তিগণ বিনাশ্রমে ধন প্রাপ্ত হলে এমনই আত্মহারা হয়ে যায় যে
, তাদের হিতাহিত জ্ঞানবুদ্ধি
লপ্ত হয়ে যায়।শত্রুপক্ষ তখন মিত্রভাবে তাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে আত্মবিচ্ছেদ ঘটিয়ে
দেবার উদ্দেশ্যে ক্রমাগত একের কাছে অপরের দোষ প্রদর্শন করে পরস্পরের মধ্যে ক্রোধ ও
শত্রুতার সৃষ্টি করে। এইরকম হলে তাদের সর্বদাই সর্বনাশ ঘটে।



এটি
মহাভারতের আদিপর্ব-এর গজ-কচ্ছপের বিবরণ থেকে নেওয়া হয়েছে

বৃহস্পতিবার, ২১ এপ্রিল, ২০২২

ভারতবর্ষে কয়টি দর্শন সম্প্রদায় পাওয়া যায়?

ভারতীয় দর্শন সম্প্রদায়

ভারতীয় দর্শনের নয়টি শাখা বা সম্প্রদায় আছে। সম্প্রদায়গুলিকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। একটি নাস্তিক সম্প্রদায়, অপরটি আস্তিক সম্প্রদায়। চার্বাক, জৈন ও বৌদ্ধ- এই তিনটি শাখা নাস্তিক সম্প্রদায়ভুক্ত। ন্যায়, বৈশেষিক, সাংখ্য, যোগ, মীমাংসা এবং বেদান্ত- এই ছয়টি আস্তিক সম্প্রদায়ভুক্ত। নাস্তিকরা বেদের প্রামাণ্য স্বীকার করেন না এবং ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করেন। আর আস্তিকরা বেদকে প্রমাণ্য গ্রন্থ বলে মনে করেন। তাহলেও নাস্তিক চার্বাক দর্শনের সঙ্গে নাস্তিক বৌদ্ধ ও জৈন দর্শনের বিস্তর পার্থক্য
রয়েছে।

চার্বাক দর্শনে কঠোরভাবে বেদের বিরোধিতা করা হয়েছে। কিন্তু বৌদ্ধ ও জৈন দর্শনে কঠোরভাবে বেদের বিরোধিতা করা হয়নি। বেদের বিরোধিতা করাই চার্বাক দর্শনের মূল লক্ষ্য। কিন্তু বেদকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা বৌদ্ধ ও জৈন দর্শনের উদ্দেশ্য নয়।

চার্বাকরা প্রত্যক্ষ প্রামাণ্যবাদী। এই মতে ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা জ্ঞানের একমাত্র উৎস। সেজন্য প্রত্যক্ষযোগ্য বিষয়ের মধ্যেই তাঁদের দার্শনিক চিন্তা সীমাবদ্ধ। কিন্তু জৈন ও বৌদ্ধ দর্শনে অনুমানকে প্রমান বলে স্বীকার করা হয়েছে। এইজন্য দর্শন দুটিতে অনুমান বা যুক্তির ভিত্তিতে অপ্রত্যক্ষ বা অতীন্দ্রিয় নানা বিষয়ের আলোচনা করা হয়েছে।

চার্বাক সম্প্রদায় জড়বাদী এবং নিত্য আত্মায় বিশ্বাসী নন। তাঁরা চৈতন্য বিশিষ্ট দেহকেই আত্মা বলেছেন। কিন্তু বৌদ্ধ ও জৈন সম্প্রদায় জড়বাদী নন। এই দুটি দর্শন বেদ বিমুখ হলেও আধ্যাত্মবাদী দর্শন। বৌদ্ধ দর্শনের যোগাচার শাখা বিজ্ঞান বা চেতনাকে একমাত্র তত্ত্ব বলেছে। জৈন দর্শনে আত্মা স্বীকার করা হয়েছে। জৈনমতে আত্মা হল দেহ থেকে ভিন্ন একটি স্থায়ী পদার্থ এবং চৈতন্য হল আত্মার স্বরূপগত ধর্ম। এছাড়া বৌদ্ধ দর্শনেও আত্মা স্বীকার করা হয়েছে, তবে তাঁরা আত্মাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই মতে নিত্য আত্মা নেই। আত্মা হল পরিবর্তনশীল মানসিক অবস্থার ধারা।

চার্বাক, জৈন ও বৌদ্ধ- এই তিনটি দর্শনই নিরীশ্বরবাদী। এদের কোনটিতেই জগৎস্রষ্টা হিসাবে ঈশ্বর স্বীকৃত নন।কিন্তু চার্বাকরা যে অর্থে নিরীশ্বরবাদী, জৈন ও বৌদ্ধরা সেই অর্থে নিরীশ্বরবাদী নন। কারণ বৌদ্ধদর্শনে বুদ্ধদেবের উপর এবং জৈন দর্শনে মুক্ত, পূর্ণ সিদ্ধপুরুষদের ওপর দেবত্ব আরোপ করা হয়েছে।

চার্বাক দর্শনে ধর্ম স্বীকৃত নয়। এখানে ধর্ম মানেই জীবের দেহধর্ম। কিন্তু জৈন ও বৌদ্ধ দর্শনের ভিত্তি হিসাবে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম রয়েছে। ফলে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও অনুশাসনের প্রসঙ্গ এই দুটি দর্শনে অনিবার্যভাবে এসে পড়ে।

সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে বৌদ্ধ ও জৈন দর্শনকে সম্পূর্ণভাবে নাস্তিক্যবাদ বলা যায় না, যে অর্থে চার্বাকদের নাস্তিক বলা হয়।

আস্তিক সম্প্রদায়ভুক্ত ছয়টি সম্প্রদায়-এর মধ্যে ন্যায় দর্শন, বৈশেষিক দর্শন, যোগ দর্শন হল ঈশ্বরে বিশ্বাসী আর সাংখ্য দর্শন, মীমাংসা দর্শন, বেদান্ত
দর্শন এরা হল ঈশ্বরে অবিশ্বাসী।

ন্যায় দর্শন:-

ন্যায় দর্শন হল সর্বশাস্ত্র-প্রদীপস্বরূপ। গৌতমমুনি বা অক্ষপাদ এই দর্শনের সূত্রকার। প্রধানত প্রমা ও প্রমাণের আলোচনাকে কেন্দ্র করে ন্যায় দর্শন বিস্তার লাভ করেছে। এজন্য এই দর্শনকে আন্বীক্ষিকী বলা হয়। ন্যায় দর্শনে চারটি প্রমাণ স্বীকৃত। এই চারটি প্রমাণ হল প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান ও শব্দ। ন্যায় দর্শন বস্তুবাদী দর্শন।

বৈশেষিক দর্শন :-

মহর্ষি কণাদ বৈশেষিক দর্শনের সূত্রকার। তিনি 'উলুক' নামেও পরিচিত। এই জন্য এই দর্শনকে 'ঔলুক্য দর্শন'ও বলা হয়। এই সূত্রের কোন প্রকৃত ভাষ্যগ্রন্থ পাওয়া যায় না। প্রসস্তপাদাচার্যের পদার্থধর্মসংগ্রহ বৈশেষিক সূত্রের ভাষ্যস্থানীয় গ্রন্থ। বৈশেষিক সম্প্রদায় দুটি প্রমাণ স্বীকার করেন- প্রত্যক্ষ ও অনুমান। এছাড়া বৈশেষিক সম্প্রদায় সাতটি পদার্থ স্বীকার করেছে। এই সাতটি পদার্থ হল দ্রব্য, গুণ, কর্ম, সামান্য, বিশেষ, সমবায় ও অভাব। বৈশেষিক দর্শনে পরমাণুতত্ত্বই সমধিক প্রসিদ্ধ।

সাংখ্য দর্শন:-

সাংখ্য দর্শনকে সর্ব প্রাচীন দর্শন বলে মনে করা হয়। কপিলমুনি এই দর্শনের সূত্রকার। ঈশ্বরকৃষ্ণের সাংখ্যকারিকা এই দর্শনের প্রাপ্ত গ্রন্থাদির মধ্যে আদি গ্রন্থ রূপে বিবেচিত। সাংখ্য দর্শন দ্বৈতবাদী। মোট ২৫টি তত্ত্ব এই দর্শনে স্বীকৃত। এদের মতে জগৎ সৃষ্টির ব্যাপারে ঈশ্বরের কোন ভূমিকা নেই এবং ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকারের কোন  প্রয়োজন নেই। সাংখ্য দর্শনে প্রত্যক্ষ, অনুমান ও শব্দ এই তিনটি প্রমাণ স্বীকৃত।

যোগ দর্শন:-

সাংখ্য ও যোগ দর্শন সমানতন্ত্র। সাংখ্য দর্শনের ২৫টি তত্ত্বের সঙ্গে ঈশ্বরতত্ত্বও যোগ দর্শনে স্বীকৃত। ঋষি পতজ্ঞলি এই দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা। বেদব্যাসের ব্যাসভাষ্য যোগসূত্রের প্রাচীন ভাষ্যগ্রন্থ। যোগ দর্শন যোগ বা সমাধির উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। এই দর্শনে জগতের পরিণামের হেতুরূপে ঈশ্বর স্বীকৃত। এই মতে অষ্টাঙ্গ যোগের মাধ্যমে জীব দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করতে পারে। সাংখ্য দর্শনের ন্যায় যোগ দর্শনও
প্রত্যক্ষ
, অনুমান ও শব্দ - এই তিনটি প্রমাণ স্বীকার করে।

মীমাংসা দর্শন:-

জৈমিনি মীমাংসা দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর পূর্বমীমাংসাসূত্র এই সম্প্রদায়ের মূল গ্রন্থ। বেদের কর্মকাণ্ডের উপর এই দর্শন প্রতিষ্ঠিত। এই মতে বেদ অপৌরুষেয়। সুতরাং ঈশ্বর স্বীকারের কোন প্রয়োজন নেই। মীমাংসা সম্প্রদায় প্রভাকর ও ভাট্ট এই দুই উপসম্প্রদায়ে বিভক্ত। প্রভাকর সম্প্রদায় প্রত্যক্ষ,অনুমান, উপমান, শব্দ ও অর্থাপত্তি এই পাঁচটি প্রমাণ এবং ভাট্ট সম্প্রদায় এই পাঁচটি ছাড়াও অনুপলব্ধি নামক স্বতন্ত্র ষষ্ঠ প্রমাণ স্বীকার করে।

বেদান্ত দর্শন:-

উপনিষদ্‌ভিত্তিক দর্শন বা উপনিষদের দর্শনকে বলা হয় বেদান্ত দর্শন। সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ্‌-প্রতিটি বেদ এই চারটি অংশে বিভক্ত। সংহিতা ও ব্রাহ্মণ কর্মকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত, আরণ্যক ও উপনিষদ্‌ জ্ঞানকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত। কর্মকাণ্ড ক্রিয়াপ্রধান ও জ্ঞানকাণ্ড বিচার প্রধান। বাদরায়ণ ব্রহ্মসূত্র রচনা করে বেদান্তকে এক যুক্তিনির্ভর দর্শন সম্প্রদায়ে পরিণত করেন। তাই ব্রহ্মসূত্র-ই বেদান্ত দর্শনের মূল গ্রন্থ।

বেদান্ত দর্শনের নয়টি উপসম্প্রদায় আছে। যার মধ্যে অন্যতম দুটি উপসম্প্রদায় হল অদ্বৈতবেদান্ত দর্শন ও বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শন।

শঙ্করাচার্য ব্রহ্মসূত্রের শারীরকভাষ্য রচনা করে বেদান্তের যে উপসম্প্রদায় সৃষ্টি করেন অদ্বৈতবেদান্ত নামে পরিচিত। অদ্বৈতবেদান্তের মূল বক্তব্য হল ব্রহ্মসত্য, জগৎ মিথ্যা এবং জীব ব্রহ্মস্বরূপ।

ব্রহ্মসূত্রের উপর শ্রীভাষ্য রচনা করে রামানুজ যে নতুন বেদান্ত-উপসম্প্রদায় প্রবর্তন করেন তার নাম বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শন।এরা তিনটি প্রমাণ স্বীকার করে- প্রত্যক্ষ, অনুমান ও শব্দ।

সবশেষে একটি কথা আস্তিক ও নাস্তিক বলতে আমরা ঈশ্বরে বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী একথা বলে থাকি; কিন্তু এটি সঠিক নয়। কারণ এমন আস্তিক সম্প্রদায় রয়েছে যারা ঈশ্বরে অবিশ্বাসী। তাই সঠিক কথাটি হল যারা বেদে বিশ্বাসী তারা আস্তিক আর যারা বেদে অবিশ্বাসী তারা নাস্তিক।

বুধবার, ৬ এপ্রিল, ২০২২

হিন্দু তথা সনাতন ধর্মের সমস্ত ধর্ম গ্রন্থসমূহ

 

ভারতের সনাতন ধর্মগ্রন্থ সমূহ

ভারতের সনাতন ধর্মগ্রন্থ হল "বেদ",যা প্রথম গান করে মুখে-মুখে ও কানে শুনে প্রচারিত হত। যেজন্য এর আরেক নাম শ্রুতি। এই "বেদে"র আবার এই ৪টি ভাগ: ঋক, সাম, যজু ও অথর্ব। প্রতিটি বেদের আবার এই ৪টি অংশ থাকে সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ। সংহিতা অংশে আছে দেবতার উদ্দেশ্যে লেখা স্তোত্র ও মন্ত্র। ব্রাহ্মণ অংশে থাকে যাগযজ্ঞের নিয়মকানুন। আরণ্যক অংশে থাকে দর্শন আর উপনিষদ অংশে থাকে আরণ্যকের দার্শনিক বিশ্লেষণ ও তত্ত্ব। এই উপনিষদকে আবার বলা হয় বেদান্ত। "শ্রীমদভাগবদ্‌গীতা" কিন্তু কোনো ধর্মগ্রন্থ নয়। "মহাভারত" মহাকাব্যের এক পরিচ্ছদ বা, অধ্যায়।

শুক্রবার, ১১ মার্চ, ২০২২

স্বামীজি মোটা বইও মুখস্ত করে ফেলতেন একনিমিষে

 স্বামীজীর পরিব্রাজক জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা

মীরাটে এসে স্বামীজীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল আরও কয়েকজন গুরুভাইয়ের সঙ্গে। তারাও
সন্ন্যাস গ্রহণ করে পরিব্রাজক বেশে ঘুরছিলেন। সকলে মিলে একজায়গায় উঠলেন। স্বামীজীর
খুব পড়াশুনোর অভ্যাস। এক গুরুভাই প্রতিদিন স্থানীয় এক লাইব্রেরী থেকে তাঁর জন্য
কয়েকটি মোটা বই নিয়ে আসেন। কিন্তু স্বামীজীর তা একদিনে পড়া হয়ে যায়। তাই পরদিনই
সেই বই ফেরত দিয়ে নতুন বই আনতে হয়। লাইব্রেরিয়ান এতে ভাবলেন স্বামীজী লোককে
দেখানোর জন্য শুধুমাত্র পড়বার ভান করছেন । স্বামীজীর গুরুভাইয়ের কাছে তিনি এই
সন্দেহের ইঙ্গিতও দিলেন। স্বামীজী একথা জেনে একদিন নিজে সেই লাইব্রেরিয়ানের কাছে
হাজির হলেন এবং বললেন:
'আমি সবকটা
বই-ই ভাল করে পড়েছি। আপনার সন্দেহ হলে যে কোন বই থেকে যে-কোন প্রশ্ন করে দেখতে
পারেন।
' লাইব্রেরিয়ান
তাই করলেন। স্বামীজী সব প্রশ্নের উপযুক্ত উত্তর দিলেন দেখে লাইব্রেরিয়ানের
বিস্ময়ের সীমা রইলো না। তিনি ভাবতে লাগলেন
, এও কি সম্ভব?



রবিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

স্বামীজি দেখালেন চোরের কাছ থেকেও নতুন কিছু শেখা যায়

স্বামীজি দেখালেন চোরও একজন মহান সাধু হতে পারে

পাওহারীবাবাকে স্বামীজি খুব শ্রদ্ধা করতেন।
স্বামীজি শুনেছিলেন পাওহারি বাবার কুটিরে একবার এক চোর ঢুকেছিল। তাঁর জিনিসপত্র
চুরি করে পালাবার মুহূর্তে পাওহারীবাবার ঘুম ভেঙে যায়। চোর ভয় পেয়ে জিনিসপত্র
ফেলেই পালাতে থাকে। পাওহারীবাবা সেই জিনিসগুলি নিয়ে চোরের পেছনে পেছনে ছুটতে
থাকেন এবং বহু দূর গিয়ে চোরকে ধরে তার হাতে ওই জিনিস গুলি তুলে দিয়ে ফিরে আসেন।
স্বামী যখন হিমালয় যান
, তখন এক
সৌমদর্শন সন্ন্যাসীকে দেখে আকৃষ্ট হন। কিন্তু স্বামীজি অবাক হয়ে গেলেন যখন তাঁর
মুখের শুনলেন তিনিই সেই ব্যক্তি যিনি কিনা পাওহারি বাবার কুঠিরে চুরি করতে
গিয়েছিলেন। সাধুটি বললেন "পাওহারীবাবা যখন আমায় নারায়ন জ্ঞানে অকুণ্ঠিত
চিত্তে সর্বস্ব অর্পণ করলেন
, তখন আমি
আমার নিজের ভুল ও হীনতা বুঝতে পারলাম এবং সেই থেকে ঐহিক অর্থ ত্যাগ করে পারমার্থিক
অর্থের সন্ধান ঘুরতে লাগলাম।" এই দৃষ্টান্ত স্বামীজীর মনে গভীর রেখাপাত
করেছিল। এই সাধুর কথা মনে রেখেই পরবর্তীকালে তিনি বলতেন: পাপীদের মধ্যেও সাধুত্বের
বীজ লুকিয়ে থাকে।


কাউবয়-দের সঙ্গে স্বামীজির লড়াই

স্বামীজীর জ্ঞানই কাউবয়রা স্বামীজীর উপরই পরিক্ষা করে দেখল

আমেরিকার পশ্চিম প্রান্তে একটা নগরীতে স্বামীজি
একবার বক্তৃতায় বলেছিলেন: যিনি সর্বোত্তম সত্যে পৌঁছেছেন
, বাইরের কোনো কিছুই তাকে বিচলিত করতে পারে না।
কথাগুলি শুনল কয়েকটি কাউবয়। তারা ঠিক করল স্বামীজীর উপরেই স্বামীজীর এই কথার
পরীক্ষা চালাতে হবে। স্বামীজী তাদের গ্রামে বক্তৃতা করতে গেলে তারা একটি টব উল্টে
তার উপরে দাঁড়িয়ে তাঁকে বক্তিতা করতে বললেন। স্বামীজী একটুও দ্বিধা না করে তাই
করলেন এবং মুহূর্তের মধ্যে বক্তৃতার মধ্যে ডুবে গেলেন। এমন সময় তাঁর কানের দুপাশ
দিয়ে শোঁ শোঁ শব্দে গুলি ছুটতে লাগল। স্বামীজী কিন্তু একটুও বিচলিত না হয়ে
বক্তৃতা চালিয়ে গেলেন। বক্তৃতা শেষ হলে সেই ছেলেগুলি তাকে ঘিরে দাঁড়াল
, করমর্দন করে বলল: হ্যাঁ, তুমি সত্যিই খাঁটি লোক।



সোমবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২১

স্বামীজী জীবনের পাওয়া মহৎ শিক্ষা

একটি শিক্ষা-ভয়ঙ্করের মুখোমুখি দাঁড়াও

পর্ব-৬

বারাণসীধামে এসেছেন স্বামীজী। একদিন দুর্গামন্দির থেকে ফিরছেন, এমন সময় একপাল বানর স্বামীজীর পিছু নিল। স্বামীজী দৌড়তে লাগলেন, বানরগুলোও পেছনে ছুটল। এমন সময় একজন বৃদ্ধ সন্ন্যাসী স্বামীজীকে বললেনঃ 'থামো, জানোয়ারগুলোর মুখোমুখি রুখে দাঁড়াও। ' স্বামীজী সাহসভরে ফিরে দাঁড়ালেন-বানররা প্রথমে থমকে দাঁড়াল, তারপর ছুটে পালল। এই ঘটনা থেকে স্বামীজী জীবনের একটা মহৎ শিক্ষা পেলেন-বিঘ্ন কিংবা বিপদ দেখে কখনও পালিয়ে যেতে নেই, নির্ভয়ে তার মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। পরবর্তী জীবনে নিউইয়র্কে একটি বক্তৃতায় সময় স্বামীজী এই ঘটনার উল্লেখ করে বলেছিলেন: 'এই হল সারা জীবনের জন্য একটি শিক্ষা-ভয়ঙ্করের মুখোমুখি দাঁড়াও, সাহসের সঙ্গে তার সম্মুখীন হও। জীবনের দুঃখ-কষ্ট দেখে আমরা যখন আর পালিয়ে যাই না, ঐ বানরগুলির মতোই তখন তারা আমাদের কাছ থেকে পিছু হটে যায়। যদি আমাদের মুক্তি পেতে হয়, তবে প্রকৃতিকে জয় করে তা পেতে হবে-প্রকৃতি থেকে পালিয়ে গিয়ে নয়। কাপুরুষ কখনও জয়ী হয় না। যদি আমরা চাই যে ভয়, বাধাবিপত্তি এবং অজ্ঞতা আমাদের সামনে থেকে দূর হয়ে যাবে, তবে আমাদের সেগুলির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে।



স্বামীজি কতটা ভারতবর্ষকে ভালবাসতেন

স্বামীজির কাছে ভারত বর্ষ কেমন-তা তাঁর এই কথা
থেকেই বোঝা যায়

পর্ব-১০

Click here to know the information in English

বিদেশ থেকে ফেরবার সময় একজন ইংরেজ বন্ধু স্বামীজীকে প্রশ্ন করেছিলেন: পাশ্চাত্যের বিলাশ বৈভব্যের মধ্যে চার বছর কাটানোর পর তাঁর মাতৃভূমি তার কাছে কেমন মনে হবে? স্বামীজি উত্তর দিয়েছিলেন যে, বিদেশে আসবার আগেও আমি ভারতবর্ষকে ভালোবাসতাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ভারতের প্রতিটি ধূলিকণা আমার কাছে পবিত্র; ভারতের বাতাস আমার কাছে পবিত্র। ভারত আমার পুণ্যভূমি, আমার তীর্থস্থান।



রবিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২১

স্বামীজীর বিদ্যালয় জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা

ছোটবেলা থেকেই স্বামীজীর মন ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠা
ও সততায় পূর্ণ

পর্ব-৫

Click here to know the information in English

নরেন্দ্রনাথের ব্যাক্তিত্বে এমন আকর্ষণ ছিল যে, তিনি কোন গল্প শুরু করলে সবই সব কাজ ভুলে তাঁর কথাই শুনত। একদিন স্কুলে ক্লাসের ফাঁকে তিনি গল্প করছিলেন। গল্প এত জমে গিয়েছিল যে, শিক্ষক এসে পড়াতে শুরু করলেও সকলে পড়ার দিকে মন না দিয়ে তাঁর  কথাই শুনছিল। কিছুক্ষণ পরে শিক্ষক ব্যাপারটা বুঝতে পারেন এবং বিরক্ত হয়ে এক এক করে সবাইকে তিনি যা পড়াচ্ছিলেন সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। কেউ উত্তর দিতে পারলো না। কিন্তু নরেন্দ্রনাথ সঠিক উত্তর দিলেন কারণ তাঁর মন ছিল দু-মুখো, তিনি গল্পের ফাঁকে মনের একটা অংশ পড়ার দিতে রেখে দিতে পারতেন। এদিকে শিক্ষক যখন জিজ্ঞাসা করলেন: এতক্ষণ কে কথা বলছিল? সকলে নরেন্দ্রনাথকে দেখিয়ে দিল।শিক্ষকের তাতে বিশ্বাস হল না। তিনি নরেন্দ্র ছাড়া সবাইকে দাঁড়িয়ে থাকতে বললেন। অথচ সকলের সঙ্গে নরেন্দ্রও দাঁড়িয়ে রইলেন।শিক্ষক তখন বললেন: 'তোমাকে দাঁড়াতে হবেনা'। নরেন্দ্রনাথ বললেন: না,আমাকেও দাঁড়াতে হবে, কারণ আমিই কথা বলছিলাম। তিনি তাদের সাথে দাঁড়িয়ে রইলেন।



মা একটি শিক্ষা দিয়েছিলেন বিবেকানন্দকে

ছোটবেলা থেকেই মায়ের শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন স্বামীজি

পর্ব-৪

Click here to know the information in English

স্বামী বিবেকানন্দের মা ভুবনেশ্বরী দেবী একটি শিক্ষা দিয়েছিলেন: 'আজীবন পবিত্র থেকো, নিজের মর্যাদা লঙ্ঘন করো না।খুব শান্ত হবে, কিন্তু আবশ্যক হলে হৃদয় দৃঢ় করবে। ' মায়ের এই শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন তিনি। অপরকে যথোচিত সম্মান দিতেন এবং কেউ তাকে অসম্মান করবে তাও তিনি বরদাস্ত করতেন না। একবার বালক নরেন্দ্রনাথকে তাঁর বাবার এক বন্ধু অযথা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে থাকেন। অথচ বাড়ীতে কখনোই এমন ব্যবহার করেন না কেউ তার সঙ্গে। তাই নরেন্দ্রনাথের কাছে এমন ব্যবহার নতুন। অবাক হয়ে তিনি ভাবলেন: 'কি আশ্চর্য! আমার বাবাও আমাকে এত তুচ্ছ মনে করেন না, আর ইনি কিনা তাই ভাবেন। ' আহত সর্পের মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দৃঢ়কন্ঠে নরেন্দ্রনাথ বললেন: 'আপনার মতো অনেকে আছেন, যাঁরা মনে করেন, ছেলেমানুষ হলেই বুদ্ধি-বিবেচনা থাকে না। এ ধারণা কিন্তু নিতান্ত ভুল।' নরেন্দ্রনাথ অত্যন্ত চটে গেছেন দেখে সেই ভদ্রলোক নিজের ভুল স্বীকার করেছিলেন।



স্বামী বিবেকানন্দের একটি চরম শিক্ষা দেওয়ার ঘটনা

স্বামী বিবেকানন্দ একটি চরম শিক্ষা দিয়েছিলেন সবাইকে সেই কথাই তুলে ধরব এখানে

পর্ব-৩

Click here to know the information in English

স্বামীজীকে একবার এক ব্যাক্তি বলেছিলেন: সন্ন্যাসীর পক্ষে নিজর দেশের মায়া ত্যাগ করে সব দেশকে একই রকম দৃষ্টিতে দেখা উচিত। স্বামীজী সেই ব্যাক্তিকে উত্তর দিয়েছিলেন: যে আপনার মাকে ভাত দেয় না, সে অন্যের মাকে কি পুষবে? ' অর্থাৎ  সন্ন্যাসীরও উচিত মাতৃভূমিকে ভালবাসা। নিজের দেশকেই যে ভালবাসতে পারে না, সে গোটা পৃথিবীকে আপন করে নেবে কি করে? প্রথমে স্বদেশপ্রেম, স্বদেশপ্রেমের সিঁড়ি বেয়ে বিশ্বপ্রেম।


স্বামীজীর বিনা দোষে শাস্তি পাওয়ার ঘটনা

স্বামীজীর জীবনের স্মরণীয় ঘটনা

পর্ব-২

Click here to know the information in English

স্কুলে একদিন বিনাদোষে নরেন্দ্রকে শাস্তি পেতে হয়।ভূগোলের ক্লাসে নরেন্দ্রনাথ সঠিক উত্তরই দিয়েছিলেন,কিন্তু মাষ্টারমশায়ের মনে হল তাঁর উত্তর ভুল।তাই তিনি নরেন্দ্রকে শাস্তি দিলেন।নরেন্দ্র বারবার প্রতিবাদ করলেনঃ 'আমার ভুল হয়নি,আমি ঠিকই বলেছি।' কিন্তু এতে মাস্টারমশাই আরও রেগে গেলেন,বেত দিয়ে নির্দয়ভাবে নরেন্দ্রকে মারতে লাগলেন।মা তাঁকে সান্তনা দিয়ে বললেন: 'বাছা,তোমার যদি ভুল না হয়ে থাকে,তবে এতে কি এসে যায়? ফল যাই হোক না কেন,সর্বদা যা সত্য বলে মনে করবে তাই করে যাবে।' মায়ের এই উপদেশের পরিপূর্ণ রূপ নরেন্দ্রনাথ দেখেছিলেন গুরু শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, আচরণেও দেখাতেনঃ 'সত্যই কালির তপস্যা।' মা এবং গুরুদেব উভয়ের মধ্যেই যে সত্যনিষ্ঠার আদর্শ দেখেছিলেন,তা স্বীয় জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে রূপায়িত করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ।পরবর্তীকালে তাই বিবেকানন্দের কাছ থেকে জগৎ শুনেছে মহাবলিষ্ঠ এই বাণী : 'সত্যের জন্য সবকিছু ত্যাগ করা যায়, কিন্তু কোন কিছুর জন্যই সত্যকে ত্যাগ করা যায় না।



স্বামীজীর জীবনের একটি বন্ধু সুলভ ঘটনা

স্বামীজীর জীবনের স্মরণীয় ঘটনা

পর্ব-১

Click here to know the information in English

বি.এ. পরীক্ষার জন্য টাকা জমা দেওয়ার সময় হয়েছে।নরেন্দ্রের সহপাঠী সকলেই টাকা জমা দিয়েছে-কেবল হরিদাস ছাড়া।সে বড় গরীব, টাকা যোগাড় করতে পারেনি। শুধু পরীক্ষার ফি-ই নয়, এক বছরের বেতন বাকি। হরিদাসের পক্ষে ফি-র টাকাটা কোন মতে দেওয়া সম্ভব, কিন্তু এক বছরের বেতন দেওয়া অসম্ভব।সব শুনে নরেন্দ্র এগিয়ে এলেন। তিনি জানতেন এরকম বিশেষ ক্ষেত্রে টাকা মুকুব করার ব্যবস্থা আছে আর তা আছে কলেজের বৃদ্ধ কেরানী রাজকুমারবাবুর হাতে।ছেলেরা যখন টাকা জমা দিচ্ছে,নরেন্দ্র তখন রাজকুমারবাবুর কাছে গিয়ে বললেন: 'মশায়,হরিদাস দেখছি মাইনেটা দিতে পারবে না; আপনি একটু অনুগ্রহ করে তাকে মাপ করে দিন।তাকে পাঠালে সে ভালরকম পাস করবে; আর না পাঠালে সব মাটি।' রাজকুমারবাবুর মেজাজ ভাল ছিল না-মুখবিকৃতি করে বললেন: 'তোকে জ্যাঠামি করে সুপারিশ করতে হবে না; তুই যা, নিজের চরকায় তেল দেগে যা।আমি ওকে মাইনে না দিলে পাঠাবো না।' নরেন্দ্র চিন্তায় পড়লেন।তাঁর নিজের পক্ষেও অত টাকা যোগাড় করা কঠিন- অথচ তাড়াতাড়ি টাকা যোগাড় না করলে বন্ধু পরীক্ষায় বসতে পারবে না।কি করা যায়? মাথায় তাঁর একটা বুদ্ধি খেলে গেল।

বাড়ী না ফিরে সেদিন সন্ধ্যায় তিনি হেদোর কাছে এক গুলির আড্ডার কাছে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন,আর গুলির দোকানের দিকে যারা আসছে তাদের ভালো করে লক্ষ্য করতে লাগলেন।হঠাৎ নরেন্দ্রনাথ অন্ধকার থেকে বেরিয়ে একজনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।রাজকুমারবাবু! নরেন্দ্রনাথ জানতেন রাজকুমারবাবু ঐ গুলির আড্ডায় নেশা করতে আসেন।নরেন্দ্রনাথকে দেখে রাজকুমারবাবুর মুখ শুকিয়ে গেছে।সুযোগ বুঝে নরেন্দ্রনাথ বললেন যে, হরিদাসের মাইনেটা যদি তিনি মুকুব না করেন, তাহলে তিনি তাঁর নেশার কথা কলেজময় ছড়িয়ে দেবেন।রাজকুমারবাবু তখন বিপদ বুঝে বললেন: 'বাবা রাগ করিস কেনো? তুই যা বলছিস তাই হবে।তুই যখন বলছিস আমি কি তা না করতে পারি?' কার্যসিদ্ধি হয়েছে দেখে নরেন্দ্রনাথ ফিরে চললেন।তিনি চোখের আড়াল হতেই রাজকুমারবাবু এদিক-ওদিক দেখে গলির আড্ডায় ঢুকে পড়লেন।
পরদিন সকাল হতে না হতেই নরেন্দ্রনাথ হরিদাসের বাড়িতে গিয়ে বন্ধুকে ডেকে বললেন: 'ওরে খুব ফুর্তি কর,তোর মাইনের টাকাটা আর দিতে হবে না।' তারপর গত সন্ধ্যার ঘটনাটা অনুপূর্বক বর্ণনা করে দুজনেই হাসিতে ফেটে পড়লেন।